ভয় দেখানো সাংবাদিকতা
ডে-নাইট-নিউজ ;
প্রকাশিত: শনিবার, ৩০ আগষ্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৫৪ পিএম;
ভয় দেখানো সাংবাদিকতা
ভয় দেখানো সাংবাদিকতা: শোকজকৃত শিক্ষক নাফসি তালুকদার প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট
.
গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রকে বলা হয় “রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ”। কারণ, সংবাদমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরে, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। সত্য সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের উপর হামলা, মামলা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি নতুন কোনো বিষয় নয়। এরই সর্বশেষ উদাহরণ জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার ময়েন উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) এম এ জি নাফসি তালুকদারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক।.
.
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও শোকজ: গত ২৬ আগস্ট সকালে বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করার অভিযোগ ওঠে নাফসি তালুকদারের বিরুদ্ধে। "স্যার প্রতিদিন দেরিতে আসে ক্লাসে"—শিক্ষার্থীদের এমন মন্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি এই শারীরিক শাস্তি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ করে। তবে শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতনই একমাত্র অভিযোগ নয়; সরকারি জায়গা দখল করে দলীয় অফিস খোলা, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তদন্তাধীন রয়েছে।
.
সাংবাদিকদের প্রতি হুমকি: ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর নাফসি তালুকদার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, তিনি সরাসরি ফোন করে কিংবা লোক পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছেন এবং ডাকাতি বা অন্যান্য ফৌজদারি মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়েছেন।
.
-
দৈনিক বাংলার জয়পুরহাট প্রতিনিধি রাব্বিউল হাসান তার ফেসবুকে খোলা চিঠি আকারে লিখেছেন, যদি তার বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয় তবে তার দায়ভার নিতে হবে নাফসি তালুকদারকে।.
-
দৈনিক কালের কণ্ঠের কালাই প্রতিনিধি সাউদ আব্দুল্লাহ বলেছেন, সাংবাদিকতা আজ জীবন-মরণের প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে; সত্য বলার দায় এখন ভয়াবহ ঝুঁকির সমান।.
-
নাগরিক টেলিভিশনের জয়পুরহাট প্রতিনিধি মাহফুজ রহমান, এনটিভি ও দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম পাভেল এবং আই নিউজ এর জয়পুরহাট প্রতিনিধি আবু রায়হানও ফোনে হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।.
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের ভূমিকা: জয়পুরহাট ও কালাই প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা এ ঘটনাকে পেশাগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন। তারা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের থানায় জিডি করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক জিডিও করেছেন।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: সাংবাদিকতা ও ভয়ভীতি: বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের উপর হামলা, মিথ্যা মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকি বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকরা প্রায়শই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন। ফলে পেশাগতভাবে তারা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়া। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, সত্য সংবাদ প্রকাশ করা যেন একটি অপরাধে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
শিক্ষকের ভূমিকা ও নৈতিক সংকট: একজন শিক্ষক সমাজে জ্ঞান ও নৈতিকতার আলো ছড়ান। তার কাছে শিক্ষার্থী যেমন নিরাপত্তা আশা করে, তেমনি সমাজও শিষ্টাচার ও দায়িত্বশীলতার দৃষ্টান্ত প্রত্যাশা করে। অথচ এখানে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন, আবার সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন—যা পেশাগত ও নৈতিক মানদণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
উপসংহার: সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা কেবল ব্যক্তি সাংবাদিকের জন্য নয়, পুরো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যই হুমকিস্বরূপ। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হবে, যেখানে সত্য চাপা পড়বে এবং অন্যায় হবে স্বাভাবিক। তাই এ ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সুশীল সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
.
লেখক: শফিউল বারী রাসেল (কবি, গীতিকার, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক) .
.
ডে-নাইট-নিউজ /
সম্পাদকীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ
আপনার মতামত লিখুন: