.
জয়পুরহাট প্রতিনিধি : বাংলা সংগীত জগতের ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যাঁরা কেবল গান লেখেন না—গানের ভেতর দিয়ে সময়, সমাজ আর মানুষের জীবনকে ধরে রাখেন। গীতিকার ও সুরকার শামসুদ্দিন হীরা তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দুই হাজারেরও বেশি গান রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন, দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি।.
সংস্কৃতি ছিল তাঁর রক্তে, গানের প্রেম ছিল তাঁর নিঃশ্বাসে। শামসুদ্দিন হীরার কাছে গান কখনো পেশা ছিল না—গান ছিল জীবন। এক একটি শব্দ, এক একটি সুর তাঁর ভেতরে আনন্দের ঢেউ তোলে। সেই ঢেউয়ে ভেসে তিনি খুঁজে নেন মানুষের ভালোবাসা, মানুষের কান্না, মানুষের স্বপ্ন।.
.
.
১৯৫৩ সালে ১ জানুয়ারি জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার পূর্ব সড়াইল গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা প্রয়াত বায়তুল্লাহ শাহ ছিলেন সংগীতপ্রাণ, শুদ্ধচেতা একজন মানুষ। মা প্রয়াত ছুন্সি বেওয়া ছিলেন সংসারের নিরব শক্তি। পরিবার থেকেই গানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, প্রথম প্রেম। সে সময় জয়পুরহাটে হাতে গোনা কয়েকটি বাড়িতেই বসত গানের আসর—তাঁদের বাড়ি ছিল তার অন্যতম। সেই আসরে বসে বসে কিশোর হীরা নিজেকে ডুবিয়ে দিতেন গানের চর্চায়।.
.
জেলা পর্যায়ের নানা অনুষ্ঠানে গান গেয়ে পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। ১৯৭৩ সাল থেকে নিজের লেখা গানে নিজেই কণ্ঠ দিতে শুরু করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই উপলব্ধি করেন—গায়ক হিসেবে নয়, গীতিকার ও সুরকার হিসেবেই তাঁর পথচলা আরও গভীর, আরও শক্ত। ভাব, ভাষা ও ছন্দের মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করলেন এক নতুন স্বরভাষা।.
১৯৭৪ সালে তাঁর লেখা ১০টি গান নিয়ে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী নীনা হামিদের কণ্ঠে প্রকাশিত হয় একটি লংপ্লে রেকর্ড। পরের বছর অ্যালবামটি বাজারে আসতেই সবগুলো গান শ্রোতামহলে সাড়া ফেলে। সেই মুহূর্ত থেকেই শামসুদ্দিন হীরা বাংলা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন একটি নাম, একটি বিশ্বাস হিসেবে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।.
.
.
কাজের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে বিশ্রামের সময়টুকুও যেন বিলাসিতা। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশে থাকা, দীর্ঘ ড্রাইভ—সবখানেই তাঁর সঙ্গী ছিল গান। গান লেখার তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় কিছু বিস্ময়কর গল্প।.
একবার ব্যাংক সফরে গিয়ে শপিংয়ের ব্যস্ততায় পাসপোর্ট ও ভিসাসহ ব্যাগ হারিয়ে ফেলেন। নিঃস্ব, অসহায় হয়ে বসে থাকেন। মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকে হারানোর আতঙ্ক। ঠিক সেই মুহূর্তেই কলমের ডগায় জন্ম নেয়—
“দুই দিনের এক ভিসা দিয়া এই দুনিয়ায় পাঠাইয়া, আখের কাস্টমে বাইন্ধ না দয়াল আমারে...” পরে অবশ্য ব্যাগ ফিরে পেয়েছিলেন, কিন্তু গানটি থেকে গেছে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে।.
.
আরেকটি ঘটনা আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের। জামালপুর জেলার যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় গিয়ে তিনি নিজের চোখে দেখেন নদীভাঙনের ভয়াল রূপ। ভিটেমাটি হারানো মানুষ, চোখের জলে ভেজা স্বপ্ন, বুকভরা হাহাকার—তিনি শুধু দেখেননি, অনুভব করেছিলেন। সেই অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে জন্ম নেয় অমর গান—
“নদীরে ও নদীরে, তুই একটু দয়া কর,
ভাঙিস না আর বাপের ভিটা বসতবাড়ি ঘর।”
এ গান কেবল একটি গান নয়—এটি জীবনের দলিল, মানুষের আর্তনাদ।.
.
তার কথা ও সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলা সংগীতের প্রায় সব বড় শিল্পী—নীনা হামিদ, সৈয়দ আবদুল হাদি, রুনা লায়লা, ফিরোজ সাঁই, এন্ড্রু কিশোর, মুজিব পরদেশী, আশরাফ উদাস, দিলরুবা খান, রথীন্দ্রনাথ রায়, নাদিরা বেগম, কাঙ্গালীনি সুফিয়া, সামিনা চৌধুরী, রিজিয়া পারভীন, বেবি নাজনীন, মনির খান, মনি কিশোর, আসিফ আকবর, মনি কিশোর, রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনি, খালিদ হাসান মিলু, আলম আরা মিনু, সুলতানা চৌধুরী, বেলাল খানসহ অসংখ্য গুণী শিল্পী।.
.
তার কথা ও সুরে মনির খানের কণ্ঠে—"দুই দিনের ভিসা দিয়া", "দরদী সবার সবই তো আছে আমার আছে কি", "কত সুখে আছি আমি", "নদীরে ও নদীরে", "বিচারপতি তোমার কাছে বিচার না পেলে", "আমার অন্তরে ঘা", "কবি চায় ছন্দ'', ''ক্যান পিরিতি করিলাম", "আর কি দেখা পাবোরে তার", "আমি স্বপ্নে দেখি যারে", "আমার এ পোড়া বুকে", "কারে ভালো বাসলাম আমি", "কে যাও তুমি লজ্জাবতী"; সৈয়দ আবদুল হাদির কণ্ঠে—"এ জীবন নগরে", এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে—"আমি চাই না কারো মনে আঘাত দিতে", "মাটির মানুষ মাটি হবে", "মন মন মন চায় নীল নীল জ্যোৎস্নায়"; খালিদ হাসান মিলুর কণ্ঠে— "জীবনপুরের জীবন গাঙ্গে"; ডলি সায়ন্তনির কন্ঠে— "মনচোরা'', ''আমিও মানুষ'', ''কী আগুন জ্বালাইয়া গেলি'' "তোমার আমার প্রেম", "আগুনও পোড়েনি"; আলম আরা মিনুর কণ্ঠে—" যার কথা মনে হলে", মনি কিশোরের কণ্ঠে—"কী পেলাম" ; আসিফের কন্ঠে—"মরণ ছাড়া গতি নাই" বেলাল খানের কণ্ঠে—"তুমি তো এমন ছিলে না' ; নীনা হামিদের কণ্ঠে— "তোর পিরিতে ঘুণ ধরাইলো", "ও প্রাণের নাগর", "কে কান্দেরে বিনয় করে", "অন্তরে অনেক দুঃখ", "জানলে প্রাণ বন্ধু", "আমার মন পাগল"; সাথীর কণ্ঠে—"যেদিন বাবার মৃত্যু হলো", "রিমোর্ট কন্ট্রোল", "বাঁচবো না আমি", "তোমাকে না দেখলে", "ওই চাঁদ ঝরানো রাতে", "আমি চাই তোমাকে", "কত ঝড় বয়ে যায়" এমন অগণিত গান আজও মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী।.
চলচ্চিত্রের গান, নাটক, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল—সবখানেই তাঁর অবাধ বিচরণ। আধুনিক, ফোক, ভক্তিমূলক, আধ্যাত্মিক, চলচ্চিত্রের গান—সব ধারাতেই তিনি সমান সাবলীল।.
গানের পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠিত। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার ভীষণ আনন্দঘন। পুরো পরিবারই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। বড় ছেলে শফিউল বারী রাসেল কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার ও চ্যানেল আই এর সাংবাদিক। কন্যা সামছুন নাহার রুমা গ্লোবাল টিভির নিউজ প্রেজেন্টার। মেঝ ছেলে শরিফুল হক সোহেল একজন ব্যবসায়ী এবং গীতিকার ও সুরকার। ছোট ছেলে সজিবুল ইসলাম পাভেল এনটিভির সাংবাদিক।.
.
শামসুদ্দিন হীরা বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নতুনত্ব আর সৃজনশীলতার সঙ্গেই থাকতে চান। গানের কথায় মানুষের বাস্তব জীবন তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। এমন গান তিনি লিখতে চান, যা হাজার বছর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।.
.
ভীষণ মিশুক, আড্ডাপ্রিয় ও সদালাপী এই মানুষটি কখনো জৌলুসের পেছনে ছোটেননি। মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় পুরস্কার মনে করেন। তার লেখা, তার সুর, তার গান—মাটির গন্ধে ভেজা মানুষের কথা হয়ে—চিরকাল বেঁচে থাকুক মানুষের হৃদয়ের গভীরে।.
ডে-নাইট-নিউজ /
আপনার মতামত লিখুন: