খুলনার কয়রায় জরিপকৃত খাবার পানির উৎসের অর্ধেকেরও বেশি লবণাক্ত; খাবার পানি এবং অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) বিষয়ক একটি সমন্বিত গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গবেষকরা
ঢাকা, বাংলাদেশ, ২৪ আগস্ট ২০২৬ – উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং এর পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোক এর বাড়তি ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি একই সাথে খাবার পানির নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং অসংক্রামক রোগ (এনসিডি)) মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
আজ মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি (icddr,b)-এর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন-এর সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি আয়োজিত "পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ" শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নীতি ও ফলাফল প্রকাশ সেমিনারে এই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়।.
.
আইসিডিডিআর,বি-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ ‘এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন। কর্মসূচির আওতায় খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিক এর আওতাধীন এলাকার ১৭২টি গ্রামে খাবার পানির উৎসগুলোর লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭,৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন, যার মধ্যে ৬,৭০৩টি (২৪.২%) খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫.৩% এবং আশাশুনিতে ২৩.৩% উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।.
ড. আলিয়া বলেন, “উপকূলীয় বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যে পানির ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই পানিই এখন ক্রমশ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানির লবণাক্ততা এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আর গর্ভাবস্থায় নারীরা বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।”.
গবেষণায় আরেকটি অংশে কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫,৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হৃদরোগ ও স্ট্রোক এর ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের (২১.৬%) আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (হৃদরোগ কিংবা স্ট্রোক) এর ঝুঁকি (কমপক্ষে ১০% বা তার বেশী ) রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর হার কয়রায় ১৯.৭% এবং আশাশুনিতে ২৩.৬%। .
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাদল পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ইন্টারভেনশন প্যাকেজ তৈরি করেছে। পানিবিষয়ক কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি, পানির উৎসের সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও নজরদারি জোরদার করার মাধ্যমে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার এবং টিউবওয়েল, পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের জন্য একটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা।.
.
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কার্যক্রমে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার সাথে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ডিজিটাল সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি অ্যালগরিদম-ভিত্তিক ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলো-আপ কার্যক্রমে সহায়তা করবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই উভয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে।.
গত প্রায় দুই দশক ধরে উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় খাবার পানির লবণাক্ততা, বিশেষ করে সোডিয়ামের আধিক্যের সাথে রক্তচাপ বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস উল্লেখ করেন, বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যে খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা (health-based threshold) এখনো নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান কীভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে তা নিয়ে গবেষণা চলমান থাকার পাশাপাশি, খাবার পানির স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের জন্য তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।.
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার দেখান যে, কীভাবে গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস খাবার পানির পুকুর এবং অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির দীর্ঘমেয়াদী লবণাক্ততার কারণ হতে পারে। তিনি জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎসগুলো দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার বা বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে তা আরও উঁচু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।.
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে স্বাস্থ্যের প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ এখনও সীমিত, আর বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল ও উদ্ভাবনের ওপর গবেষণার পরিমাণ আরও কম। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে যুক্ত করে তথ্য-প্রমাণ তৈরি ও সমাধান পরীক্ষা করার মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিগুলো পূরণে কাজ করছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সাথে আমাদের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা সমস্যাটি চিহ্নিত
করার পর্যায় পেরিয়ে এখন জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপগুলো মূল্যায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”.
.
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মিসেস ফাহমিদা খানম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য লবণাক্ততা ইতিমধ্যেই বড় ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ আরও বাড়বে। এ ধরনের গবেষণালব্ধ প্রমাণ শুধু দেশের ভেতরে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো (অভিযোজন) এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রশমন কৌশল গ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ” .
বিশেষ অতিথি, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, “এ ধরনের গবেষণা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে দেয়। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমাদের নিয়মিত পরিবীক্ষণ জোরদার করতে হবে এবং পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তৈরি করতে হবে।” .
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিস শেখ মোমেনা মনি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “একজন স্বাস্থ্যকর্মী রক্তচাপ মাপতে পারেন এবং চিকিৎসা দিতে পারেন, কিন্তু একটি পরিবার যে পানির ওপর নির্ভর করে, সেই পানির মান বা প্রাপ্যতা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। খাবার পানির লবণাক্ততা যদি উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যায় ভূমিকা রাখে, তাহলে প্রতিরোধের উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।”.
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে এখন আমাদের হাতে বহু বছরের গবেষণালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রমাণ একত্র করে বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা ও নীতিতে রূপ দেওয়া, পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা।”
অনুষ্ঠানে প্যানেল ও উন্মুক্ত আলোচনায় সরকার, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ নেন। সেমিনার থেকে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সাথে নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে একীভূত করার আহ্বান জানানো হয়।.
.
ডে-নাইট-নিউজ /
আপনার মতামত লিখুন: