নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, সচিবালয়, সরকারি দপ্তর, আবাসিক ভবনসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ ও সংস্কার এই অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন নির্বাহী প্রকৌশলীদের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের কর্মকাণ্ড ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যমে উঠে আসছে। শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক পত্রিকায় নানা অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রশাসন ও জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।.
.
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সাধারণত তিন বছরের বেশি সময় অবস্থান না করার নীতি থাকলেও মোয়াজ্জেম হোসেন প্রায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে তিনি দীর্ঘ সময় একই স্থানে বহাল রয়েছেন এবং এর পেছনে কোনো ধরনের তদবির বা প্রভাব কাজ করছে কি না। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাতীয় সংসদ এলাকা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উচ্চমূল্যের হওয়ায় এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ নজর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই তদারকি কতটা কার্যকর—তা নিয়েই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।.
.
.
অভিযোগ হয়েছে, শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এ বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেনের নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে কিছু কাজ করানো হয়েছে এবং সেসব কাজের বিল পরিশোধেও অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, কিছু প্রকল্পে কাজের মান নিম্নমানের হলেও কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, তবুও বিষয়টি ঘিরে জনস্বার্থে প্রশ্ন উঠেছে।.
.
.
সংসদ ভবন এলাকা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো সাধারণত অত্যন্ত লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এসব প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার ও কর্মকর্তার মধ্যে অঘোষিত বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ বণ্টন ও বিল অনুমোদনের অভিযোগ নতুন নয়। মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম এসব আলোচনায় আসায় বিষয়টি আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।.
তার দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিক বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যেগুলোর মোট ব্যয় কয়েক শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা খুব কমই পাওয়া গেছে।.
.
আরও কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে এবং তার ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ দুদকের নজরে এসেছে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। দুদকের নিয়ম অনুযায়ী, অনুসন্ধান শেষে প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলার সুপারিশ করা হয়, আর প্রমাণ না মিললে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়।.
আরও উঠে এসেছে, অতীতে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী দীর্ঘদিন একই পদে বহাল আছেন। বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।.
.
.
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সংসদ, সচিবালয় ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে যে, তারা ক্ষমতাশালী মহলের আশীর্বাদে পদে টিকে থাকেন। মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে প্রকাশিত সংবাদগুলোতেও এই ধরনের অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যদিও সেগুলো এখনো প্রমাণিত নয়।.
এদিকে, এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেছেন, গণপূর্তের মতো দপ্তরে প্রকল্পের সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ এত বেশি যে এখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তবে তারা এটাও বলেছেন, সব কর্মকর্তা একই ধরনের কাজে জড়িত নন এবং অনেকেই সৎভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মতে, নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা উচিত নয়।.
.
জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এখানকার প্রকল্পগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত হয়। কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা বলছেন, অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।.
গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে অতীতের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। ফলে বর্তমান অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা করছেন সচেতন মহল। একই সঙ্গে তারা এটাও বলছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।.
সব মিলিয়ে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে অভিযোগ আবারও গণপূর্ত অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনে দিয়েছে। এসব অভিযোগ কতটা সত্য, আর কতটা ভিত্তিহীন—তা নির্ধারণ করবে চলমান ও ভবিষ্যৎ তদন্ত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড জনস্বার্থে নজরদারির আওতায় থাকা প্রয়োজন, যাতে অনিয়মের সুযোগ না থাকে এবং জনগণের আস্থা অটুট থাকে।.
ডে-নাইট-নিউজ /
আপনার মতামত লিখুন: