লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের মেঘনা তীরবর্তী দুর্গম বয়ারচরে কয়েকটি দস্যুবাহিনীর তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘ভোল পাল্টিয়ে’ কয়েকটি ডাকাত বাহিনী ও দস্যু গ্রুপ চরটিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। দস্যুবাহিনীর একের পর এক চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় সাধারণ মানুষ এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। সর্বশেষ দস্যুবাহিনীর দাবিকৃত চাঁদা দিতে না পারায় হামলার ভয়ে মাইনউদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী পরিবার-পরিজন নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে এলাকার বাহিরে অবস্থান করেছেন। এমতাবস্থায় ওই এলাকার বাসিন্দারা নিরাপত্তায় দুর্গম এ চরটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর তৎপরতার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।.
.
ভুক্তভোগী চরগাজী ইউনিয়নের দক্ষিণ টুমচর (বয়ারচর) এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় ব্রিজঘাট বাজারের মাংস ব্যবসায়ী মো. মাইন উদ্দিন জানান, প্রায় দুই মাস আগ স্থানীয় একটি চা দোকানের সামনে তার ছোট ছেলে মো. ফয়সাল আড্ডা দিচ্ছিল। এসময় কুখ্যাত দস্যুবাহিনী ‘ফরিদ বাহিনীর’ সেকেন্ড ইন কমান্ডার বাদশা ডাকাত সহযোগী ওয়ারেছ ডাকাতকে নিয়ে ফয়সালকে অপহরণ করে আস্তানায় নিয়ে যায়। পরে তার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা দাবি করলে তিনি নিজের একটি গরু ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে ২ লাখ টাকা বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাতের হাতে দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন। শুধু এতেই তারা থেমে যাননি। গত রোববার সকালে বাদশা, ওয়ারেছ মহিন ও মনিরসহ কয়েকজন সহযাগী নিয়ে তার বাড়িতে হানা দেন। এসময় তারা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে চাঁদা হিসেবে একটি গরু দাবি করেন। দাবিকৃত গরু না দিলে তার স্ত্রী ও ঘরে থাকা পুত্রবধূকে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে চলে যায় তারা। এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
তিনি বলেন, আমরা ফরিদ বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাত, ওয়ারেছ ডাকাত, বাদশা ডাকাত ও তার লোকজনদের গ্রেপ্তারের জন্য সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করছি।
মাইন উদ্দিনের ছেলে মো. মামুন বলেন, এক সাপ্তাহ ধরে আমরা এলাকা ছাড়া। আমি ব্রিজঘাট এলাকার একজন গাস্ত বিক্রেতা। ওয়ারেছ ও বাদশা ডাকাতের অত্যাচারে ঠিকমত ব্যবসা করতে পারছি না। প্রতিটি গরু থেকে তাদেরকে চাঁদা দিতে হচ্ছে।
এদিকে, সরেজমিন ঘুরে এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বয়ারচর এলাকাটি একটি দুর্গম চরাঞ্চল। ওই এলাকাটি বিভিন্ন ডাকাত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০২৪ সালর ৫ আগস্ট থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ব্রিজঘাট, তেগাছিয়া ও টাংকিরঘাট এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, লুটপাট, অগ্নিসংযাগ ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, জমি দখল, বসতবাড়ি ও পুলিশ ফাঁড়ি দখলসহ ডাকাত বাহিনী বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছে। এর মধ্যে ফরিদ বাহিনীর আধিপত্য সবচেয়ে বেশী। তার বাহিনীতে বাদশাহ, ওয়ারেছ, ভুট্টু, ফজলু, আলমগীর, হোসেন, আওলাদ, আইয়ুব আলী, কবির ও মাকছুদসহ অর্ধশতাধিক সদস্য রয়েছে। এসব ডাকাত সদস্যরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বয়ারচরের ব্রিজঘাট, দক্ষিণ টুমচর, নুরুল্লার সমাজ, তেগাছিয়া ও টাংকিরঘাট এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন।.
.
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাত এক সময়ে নোয়াখালীর হাতিয়ার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে ভোল পাল্টিয়ে সে বিএনপির নাম ভাঙিয় আগের চেয়েও বেশি তৎপরতা চালাচ্ছে। তার এসব অপকর্ম নিয়ে জহির উদ্দীন নামে এক বাসিন্দা রামগতি থানা ও সেনা ক্যাম্পে পৃথক দুটি অভিযোগও করেছেন। এসব ডাকাতদের বিরুদ্ধে রামগতি, হাতিয়া ও ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তাদের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন মামলা থাকলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষপ নিচ্ছে না। অন্তত ১৫ টি মামলায় এসব ডাকাতদের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেফতারি পরওয়ানা।
এসব বিষয় জানতে চাইলে অভিযুক্ত ওয়ারেছ ডাকাত তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এসব কাজের সাথে জড়িত নন। তবে, এসব বিষয়ে লেখালখি না করতে তিনি এ প্রতিবেদককে বিশেষ অপার দেন।.
ফরিদ বাহিনীর প্রধান ফরিদ ডাকাতের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফানে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করননি।
রামগতি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, বয়ারচর এলাকাটি খুবই দুর্গম। যে কারণে, অপরাধীরা সেখান বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। তবে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে চরটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, চাঁদা দিতে না পারায় ব্যবসায়ীর পরিবার এলাকা ছাড়ার বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। ভুক্তভাগীর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ওসিকে নির্দশ দেওয়া হবে।.
.
ডে-নাইট-নিউজ / নাসির মাহমুদ (লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি)
আপনার মতামত লিখুন: