লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আবদুল কাদের মুজাহিদের বিরুদ্ধে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভুয়া প্রকল্প ও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রায় ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পাশ কাটিয়ে আউটসোর্সিংয়ের জনবল দিয়ে গোপনে বিল পাস করার ঘটনাটি এখন পুরো জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।.
গোপন আঁতাঁত ও নজিরবিহীন অনিয়ম.
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মুজাহিদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উপজেলা রাজস্ব তহবিল, এডিপি ও হাটবাজার উন্নয়ন তহবিলের আওতায় প্রায় ৩০টি প্রকল্প গ্রহণ করেন। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুল আহসান ও মো. আলী ছিদ্দিক কর্মরত থাকলেও তাদের দিয়ে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) বা বিলে স্বাক্ষর করানো হয়নি। পরিবর্তে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সাকিব হোসেনকে ব্যবহার করে গোপনে নথিপত্র তৈরি ও বিল স্বাক্ষর করিয়ে ১ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।.
ম্যানুয়াল লঙ্ঘন ও নামমাত্র প্রকল্প.
উপজেলা পরিষদ ম্যানুয়ালের ১০৯ পৃষ্ঠার নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানে মেরামত, ধর্মীয় উপাসনালয় বা ক্লাবে উন্নয়ন এবং মাটি দ্বারা উন্নয়ন কাজে এই তহবিল ব্যবহারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু প্রকৌশলী মুজাহিদ বছরের শুরুতেই পকেট ভারী করার উদ্দেশ্যে এসব জনগুরুত্বহীন প্রকল্প তৈরি করেন। তিনি ই-জিপি (e-GP) টেন্ডার এড়িয়ে ‘RFQ’ (কোটেশন) ও ‘PIC’ (প্রকল্প কমিটি) পদ্ধতির মাধ্যমে তার ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে পরিচিত ‘মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স’কে দিয়ে কাজ করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।.
পকেটে গেছে প্রকল্পের টাকা: বাস্তব চিত্র.
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পের কাজই হয়েছে নামমাত্র:.
ভাঙারি দোকানে সরকারি নথি বিক্রি!.
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, প্রকৌশলী মুজাহিদ ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত উপজেলা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, পিইডিপি-১, ২, ৩ এর নথি, পরিমাপ বহি (MB) এবং কম্পিউটার সংক্রান্ত মালামাল কোনো অনুমোদন ছাড়াই তোরাবগঞ্জ বাজারের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অফিসের হিসাব সহকারী এই তথ্য সত্য বলে স্বীকার করলেও অফিস সহকারী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।.
দায়িত্বশীলদের বক্তব্য.
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার রুবেল (মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স) ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “আমি সাংবাদিকদের কেন জবাব দেব? আমি কাজ পেয়েছি, কাজ করিয়েছি।”.
নামমাত্র প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য ইয়াছিন আরাফাত কাজ কোথায় হয়েছে জানতে চাইলে তিনি আমতা আমতা করে বলেন, “কাজ করেছি, তবে কোথায় করেছি জেনে বলতে হবে।”.
অভিযুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের মুজাহিদ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কাজ চলছে।” তবে বিল আগে উত্তোলন হওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।.
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও প্রশাসক মো. রাহাত উজ জামান জানান, প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তী টেন্ডারগুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে।.
সচেতন মহলের দাবি.
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি অর্থের এই হরিলুট উপজেলার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এলজিইডির তালিকাভুক্ত সাধারণ ঠিকাদাররা এই একচেটিয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।. .
ডে-নাইট-নিউজ / লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি
আপনার মতামত লিখুন: