• ঢাকা
  • বুধবার, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ০৫ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • Govt. SL. No:-352

Advertise your products here

সুদের করাল গ্রাসে যুবকের মৃত্যু, ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার


ডে-নাইট-নিউজ ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৪ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৫৮ পিএম;
সুদের করাল গ্রাসে যুবকের মৃত্যু, ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার
সুদের করাল গ্রাসে যুবকের মৃত্যু, ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার

পরিবারের অভিযোগ, চক্রবৃদ্ধি সুদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণ গেল ইমতিয়াজের; প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি.

 .

নিজস্ব প্রতিবেদক: পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সূর্যমণি ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. ইদ্রিস গাজীর একমাত্র ছেলে মো. ইমতিয়াজ গাজী। লেখাপড়া শেষ করে বাবার সঙ্গে স্থানীয় কনকদিয়া বাজারের মমতাজ মার্কেটে মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ নামে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন। পাশাপাশি গাজিমাঝি বাজারেও একটি দোকান পরিচালনা করতেন তিনি।.

 .

এক সময় ব্যবসা ও পারিবারিক জীবন স্বচ্ছলভাবেই চলছিল। গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় যখন একটি সাইকেলও অনেকের স্বপ্ন ছিল, তখন ইমতিয়াজ পালসার মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন। ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। স্থানীয় মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবেশীদের যেকোনো বিপদে-আপদে সবার আগে এগিয়ে যেতেন, অসুস্থ রোগীর প্রয়োজনে রক্তদানও করতেন। এলাকাজুড়ে একজন ভালো ও সৎ যুবক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। পরিবারটির সঙ্গেও কারও কোনো শত্রুতা ছিল না বলে স্থানীয়রা জানান।.

 .

পরিবারের দাবি, ইমতিয়াজের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে মো. সোহাগ হাওলাদারের সঙ্গে পরিচয়ের পর। সোহাগ একই ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের কিনু হাওলাদারের ছেলে।.

 .

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোহাগ একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির সময় এক চাচাতো বোনকে নিয়ে লঞ্চে ভ্রমণের সময় তাকে ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে দেন। লঞ্চের যাত্রীরা তাকে আটক করে চাঁদপুর পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে পুলিশ তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তদন্ত শেষে সেনাবাহিনী তাকে চাকরিচ্যুত করে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তবে ওই ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।.

 .

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির আশ্রয়ে এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলেন সোহাগ। তার সহযোগীদের মধ্যে হিরন হাওলাদার, মনির ওরফে মিটার মনির, সজিব হোসেন, কলম খান, তারিকুল, সাদ্দাম সিকদার এবং নারী সদস্য সোমের্থ বেগমসহ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল রয়েছে বলে অভিযোগ।.

 .

এলাকাবাসীর দাবি, এই চক্রের সদস্যরা মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর পরিচালনা এবং অবৈধ চক্রবৃদ্ধি সুদের কারবারে জড়িত। কারও দায়িত্ব ছিল মাদক কারবার, কেউ জুয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন, আবার কেউ সুদের ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন।.

 .

স্থানীয়দের অভিযোগ, সোমের্থ বেগম নামে এক নারী সহযোগীর মাধ্যমে গ্রামের সহজ-সরল ও অভাবী নারীদের টার্গেট করা হতো। তাদেরকে সোহাগের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা এনে দেওয়া হতো।.

 .

পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহাগ এক লাখ টাকা ঋণ দিলেও দলিলে দুই লাখ টাকা লিখে রাখতেন। অশিক্ষিত ও সরল মানুষ বিষয়টি বুঝতে না পারায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করতেন। এসব লেনদেনে সাক্ষী হিসেবে থাকতেন সোমের্থ বেগম।.

 .

এভাবে অনেক পরিবারকে ঋণের জালে ফাঁসিয়ে জায়গা-জমি আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বর্তমানে অর্ধশতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।.

 .

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমতিয়াজের ব্যবসায়িক সফলতা দেখে সোহাগ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নিয়মিত দোকানে এসে আড্ডা দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ইমতিয়াজকে জুয়ায় আসক্ত করে তোলেন বলে অভিযোগ পরিবারের।.

 .

জুয়ার কারণে ধীরে ধীরে ব্যবসার মূলধন শেষ হয়ে গেলে সোহাগ উচ্চ সুদে কয়েক ধাপে টাকা ধার দেন। এরপর থেকেই ইমতিয়াজের জীবনে নেমে আসে আর্থিক সংকট।.

 .

পরিবার জানায়, দোকানের দৈনিক আয়ও সুদের টাকা পরিশোধ করতেই শেষ হয়ে যেত। পরে সুদের টাকা আদায়ে চাপ বাড়তে থাকলে ইমতিয়াজ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।.

 .

পরিবারের অভিযোগ, ইমতিয়াজ পালিয়ে যাওয়ার পর সোহাগ তার বাবা মো. ইদ্রিস গাজীর কাছে সুদের ৭ লাখ টাকা দাবি করে হুমকি দিতে থাকেন। পরে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় ঋণ করে সেই ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন ইদ্রিস গাজী।.

 .

এরই মধ্যে দেশে শুরু হয় করোনা মহামারি। লকডাউনে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারে নেমে আসে চরম সংকট।.

 .

এ অবস্থায় প্রতিবেশী আবুল কালামের স্ত্রী সোমের্থ বেগমের পরামর্শে সোহাগের কাছ থেকে আবারও ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা সুদে নেন ইদ্রিস গাজী। পরিবার দাবি করে, সেই টাকার বিপরীতে কয়েক লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করলেও ঋণের বোঝা কমেনি।.

 .

পরিবারের অভিযোগ, সোমের্থ বেগমের পরামর্শে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও থেকেও ঋণ নেওয়া হয়। সেই অর্থও সোহাগকে দেওয়া হলেও ঋণ শোধ হয়নি।.

 .

পরে সোহাগ টাকা না পেলে ইমতিয়াজকে হত্যার হুমকি দেন এবং টাকা দিতে না পারলে জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ পরিবারের।.

 .

একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে এবং ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েন ইদ্রিস গাজী।.

 .

পরিবারের দাবি, ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে কয়েক ধাপে বাজারের জমি, পুকুর, কৃষিজমি এবং শেষ পর্যন্ত বসতভিটাসহ প্রায় ৮০ লাখ টাকার সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন সোহাগ।.

 .

সব সম্পত্তি হারানোর পর পরিবারটি এলাকা ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকে তারা।.

 .

অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তায় ইমতিয়াজ ভেঙে পড়েন। পরিবার জানায়, তিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা ছাড়াই অসুস্থ ছিলেন।.

অবশেষে গত ২৯ তারিখ তিনি মারা যান।.

পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, চক্রবৃদ্ধি সুদের চাপ এবং দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনই তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ।.

 .

ইমতিয়াজের মৃত্যুর পরও পরিবারকে নতুন সংকটে পড়তে হয়। পরিবারের অভিযোগ, গ্রামের কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে সোহাগ হুমকি দেন। একই সঙ্গে অন্যান্য পাওনাদারদের চাপও ছিল।.

 .

পরে জুলাই যোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় গ্রামের চাচাতো ভাইয়ের জমিতে ইমতিয়াজকে দাফন করা হয়।.

 .

স্থানীয়দের দাবি, একই কবরস্থানে এর আগে আরও দুজনকে দাফন করা হয়েছে, যাদের মৃত্যুর পেছনেও একই সুদের চক্র দায়ী ছিল।.

 .

স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহাগ নিজের আপন মামার মৃত্যুর পরও সুদের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত লাশ দাফনে বাধা দিয়েছিলেন। পরে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় টাকা পরিশোধের পর দাফনের ব্যবস্থা হয়।.

 .

কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ বাবা, ছেলের মৃত্যু, সর্বস্ব হারানো এবং দীর্ঘদিনের নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ ইদ্রিস গাজী।.

 .

তিনি বলেন, "সুদের টাকা দিতে দিতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার একমাত্র ছেলেকেও হারালাম।".

 .

স্থানীয়দের দাবি, সোহাগের সুদের জালে পড়ে এখনো এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কালিকাপুর গ্রামের খলিল খানের ছেলে সোহেল খান, রিয়াজ, সাহানাজ বেগম, শিরিনা বেগম, গাজীমাঝি গ্রামের সুবহান গাজী, মল্লিকডুবা গ্রামের মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে মিজান, মকবুল আহমেদের ছেলে মাহবুল, আব্দুল মাঝির ছেলে খেয়ামাঝি খোকন, আহমেদ দফাদারের ছেলে আমিনুল ইসলাম, আলামিন, ফোরকান মাঝিসহ গাজিমাঝি, কালিকাপুর ও মল্লিকডুবা গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার।.

 .

সোহাগের সুদের জালে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলো এবং সচেতন মহল প্রশাসনের প্রতি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে আর কোনো ইমতিয়াজকে এভাবে জীবন দিতে হবে না।.

 .

 . .

ডে-নাইট-নিউজ /

অপরাধ বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ