
প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি | ডে-নাইট নিউজ প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, গৃহসজ্জার সামগ্রী, হস্তশিল্প ও নানা ধরনের খাবারের পসরা নিয়ে বসেছে মেলা। দেখতে আর দশটি মেলার মতো হলেও এর রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য—এখানে দর্শনার্থী ও ক্রেতা হিসেবে প্রবেশের সুযোগ শুধু নারীদের। পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় মেলাটি পরিচিত ‘বউ মেলা’ নামে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর গ্রামের সর্বজনীন দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী এ ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৭০ বছর ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্মীপূজার পরদিন এই মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে নারীদের কেনাকাটা ও আনন্দ-আড্ডা।
শতাধিক দোকানে নানা পণ্যের সমাহার
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় শতাধিক দোকানে সাজানো হয়েছে নারীদের প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, গৃহসজ্জার উপকরণ, প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের খাবার। দোকানিদের মধ্যে পুরুষ বিক্রেতাও রয়েছেন। তবে পুরুষ দর্শনার্থীদের মেলার ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। এ কারণে অনেক পুরুষকে মেলার বাইরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
বাসুদেবপুর গ্রামের পল্লবী রানী বলেন, ‘এই মেলা আমাদের নারীদের জন্য। তাই এখানে এলে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনও আসেন। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, ভাববিনিময় হয়। মেলা মানেই মিলনস্থল।’
সুজিতা পাল জানান, মেলায় এসে তাঁরা পছন্দমতো কেনাকাটা করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই মেলার জন্য তাঁরা সারা বছর অপেক্ষা করেন। তবে তাঁর স্বামীকে মেলার বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
পূরবী রানী দাস বলেন, ‘মেলায় এসে অনেক কিছু কিনছি, দেখছি। শুধু নারীদের জন্য এই আয়োজন, এখানে নারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে—এটা ভেবে গর্ববোধ করছি।’ তিনি জানান, দাদার সঙ্গে মেলায় এলেও তাঁকে বাইরে রেখে ভেতরে প্রবেশ করেছেন।
নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন, বাইরে অপেক্ষায় পুরুষরা
মেলার প্রধান ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ পুরুষ দর্শনার্থী শিবেন সরকার জানান, স্ত্রী ও সন্তানদের মেলার ভেতরে পাঠিয়ে তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন। তাঁর মতে, পুরুষরাও এই মেলা উপভোগ করেন। এখানে কোনো ঝামেলা ছাড়াই নারীরা কেনাকাটা ও ঘোরাঘুরি করতে পারেন।
অরুণ সাহা বলেন, নারীরা যাতে স্বাধীনভাবে মেলায় ঘুরতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুরুষেরাও সহযোগিতা করেন। বাইরের কোনো পুরুষ যেন মেলার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন, সে বিষয়েও তাঁরা নজর রাখেন। নারীদের জন্য নির্ধারিত এই আয়োজনকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন।
৭০ বছর ধরে চলে আসছে ঐতিহ্য
মেলার আয়োজক ও সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অশেষ রঞ্জন দাস এবং সাধারণ সম্পাদক গৌর চন্দ্র সরকার জানান, প্রায় ৭০ বছর আগে জমিদার বিমল বাবু এই মেলার সূচনা করেন। এরপর থেকে স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রতিবছর মেলার আয়োজন হয়ে আসছে।
তাঁরা বলেন, মেলায় শুধু নারীদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি আয়োজকদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দলও দায়িত্ব পালন করে।
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, ঐতিহ্যবাহী বউ মেলার সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, বউ মেলা আয়োজনের বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। তাই এ বিষয়ে তিনি অবগত নন।
দীর্ঘদিনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন স্থানীয় নারীদের কাছে শুধু কেনাকাটার স্থান নয়, বরং আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং আনন্দ ভাগাভাগিরও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
ডে-নাইট নিউজ | সত্য ও সুন্দরের খোঁজে