ডে-নাইট নিউজ | অনলাইন ডেস্ক রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ও দায়দেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা সহজামানতের মূল্য মাত্র ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, মোট পাওনার বিপরীতে জামানতের পরিমাণ মাত্র ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বাকি ৯৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ অর্থের বিপরীতে পর্যাপ্ত সহজামানত নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকের অর্থ আদায় নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের তৈরি প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, ঋণসীমা অতিক্রম, ঋণ পুনঃতপশিল, নতুন ঋণ বিতরণ এবং রপ্তানি বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর জনতা ব্যাংকের রেগুলেটরি মূলধনের ভিত্তিতে বেক্সিমকো গ্রুপের ফান্ডেড ঋণের সর্বোচ্চ সীমা হওয়ার কথা ছিল ৮৫৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ওই সময় গ্রুপটির প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ব্যাংকটির ফান্ডেড ঋণের স্থিতি ছিল ২২ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সীমার তুলনায় ঋণের পরিমাণ ছিল বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের সমঝোতা স্মারকে একক গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বেক্সিমকো গ্রুপের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার ঋণ সাত বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা হয়। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৫ হাজার ৯৭৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা পুনঃতপশিল করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এত বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সহজামানত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা করা হয়নি। নিরীক্ষা দলের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ও সংশ্লিষ্ট শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
এদিকে, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চের পরিসংখ্যানের তুলনায় চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা আরও বেড়ে ২৮ হাজার ১৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জামানতের মূল্য একই পরিমাণে বাড়েনি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি ও বকেয়া থাকার তথ্য থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছে। জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮১১তম ও ৮১৫তম সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রুপটির আটটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৪৫১ কোটি ৫ লাখ টাকার নতুন ঋণ অনুমোদন ও ছাড় করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের ৩৮৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার দায় সন্দেহজনক শ্রেণিতে খেলাপি হিসেবে উল্লেখ ছিল। একই বছরের মার্চে গ্রুপটির মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়ার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক জনতা ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বেক্সিমকো লিমিটেড ও গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণস্থিতি আর না বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিল। ওই সময় গ্রুপটির ঋণস্থিতি ছিল ২২ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
তবে নিরীক্ষা দলের দাবি, পরবর্তী সময়ে নতুন ঋণ বিতরণ ও সুদ যোগ হওয়ার ফলে ২০২৫ সালের মার্চ শেষে গ্রুপটির নিট দায় বেড়ে ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রতিবেদনে আপত্তি তোলা হয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের রপ্তানি বাণিজ্য ও কাঁচামাল আমদানিসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করেও বিভিন্ন অসংগতি পেয়েছে নিরীক্ষা দল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নমুনা হিসেবে কিছু রপ্তানি চুক্তি, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এবং প্যাকিং ক্রেডিট ঋণের নথি পরীক্ষা করা হয়। এতে বিদেশি ক্রেতার তথ্য যাচাই, এলসি অনুমোদন এবং পণ্যের মজুত তদারকিতে ঘাটতির বিষয় উঠে আসে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আমদানি করা কাঁচামাল বা উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মজুত প্রতিবেদন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা রপ্তানি আয় অন্য এলসির দায় সমন্বয়ে ব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে জনতা ব্যাংকের ২২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা দল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ডের মেয়াদ শেষে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে অর্থ ফেরত দেওয়ার শর্ত ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগের অর্থ আদায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিশেষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও আপত্তি রয়েছে।
নিরীক্ষা আপত্তির জবাবে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অনুমোদন ও অনাপত্তির ভিত্তিতে বেক্সিমকো গ্রুপকে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকের দাবি, গ্রাহকের সহজামানতের পাশাপাশি করপোরেট গ্যারান্টিও গ্রহণ করা হয়েছে। ঋণ পুনঃতপশিলের কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে পুনর্গঠন না করে কেবল কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়ানো হয়েছিল বলেও জানানো হয়।
সুকুক বন্ডের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ব্যাংক জানিয়েছে, বিনিয়োগের অর্থ আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে।
তবে নিরীক্ষা দল ব্যাংকের এসব জবাবকে আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য যথেষ্ট নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং আপত্তির আওতাভুক্ত অর্থ সুদসহ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের ক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রমের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনাপত্তি দিয়েছিল। তাঁর দাবি, সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই ঋণসুবিধা দেওয়া হয়।
সূত্র: সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও কালবেলা।
মন্তব্য করুন